জুলহাজ মান্নান ও মাহবুব তনয় স্বরণে

লিখেছেনঃ তামজিদ হোসেন

Xulhaz Mannan ভাইয়ের খুনীরা তাদের অডিও টেপে তাঁর কথা বলে হাসছিলো। তারা হাসতে হাসতে কোরানের আয়াত বল্লো, “ইয়াওমা জালিকা আলাল্লাহিল আজিজ”, এর মানে তারা বলছিলো “আল্লাহর সাহায্য তার প্রিয় বান্দাদের প্রতি আসে”।

তারা আরো বর্ণনা করে বলছিলো যে মাশাল্লাহ, আমাদের ভাইয়েরা সুন্দর করে কুপিয়েছে এবং এভাবে আরো ঘটনা তারা ঘটাতে সক্ষম।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সমকামীতা হচ্ছে ভয়ংকর অপরাধ। বাংলাদেশ দন্ডবিধির ৩৭৭ ধারা অনুযায়ী সমকামী নর-নারীকে তাদের সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্সের কারনে যাবজ্জীবন কারাদন্ড পেতে হতে পারে। পুরোনো DLR ঘাটলে এই সংক্রান্ত অনেক মামলার নজিরও পাওয়া যায়।

২৫ শে এপ্রিল ২০১৬ সালে বিকেল সাড়ে চারটায় জুলহাজ ভাইয়ের নিজের ঘরে ঢুকে আনসার উল্লাহ বাংলা টিমের খুনীরা জুলহাজ ভাই ও মাহবুব তনয়কে খুন করে চলে যায়।খুনের পর খুনীরা তাদের নানাবিধ পেইজ, ওয়েব সাইট, টুইটার থেকে দায়িত্ব স্বীকার করে। এদের চ্যালা-চামুন্ডারা জুলহাজ ভাই আর তনয়কে নিয়ে ট্রল করতে থাকে। তারা বর্ণনা করতে থাকে যে কি করে ৬ ইঞ্চির চাপাতির কোপ দিয়ে তাঁদের মেরে ফেলা হোলো।

তাঁর খুনের এক বছর পরেও বিচার শুরু করা অনেক দূরের কথা, আইন শৃংখলা বাহিনী তদন্ত রিপোর্ট দিতেই সক্ষম হয়নি। আজ পর্যন্ত তারা ১২ বার এই হত্যার তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার তারিখ পিছিয়েছে। চার্জশীট, ট্রায়াল এগুলো তো অনেক বেশী পরের ব্যাপার। সাক্ষী-সাবুদ কত কি…

জুলহাজ মান্নান ও মাহবুব তনয় হত্যাকান্ডের সুষ্ঠু বিচার খুব সম্ভবত হবে না। যে দেশের আইনে সমকামীদের যৌনতার জন্য যাবজ্জীবনের বিধান থাকে সে দেশে বিচার চাওয়ার মত বিলাসিতা বেমানান। তার উপর খুনীরা তো আল্লাহ’র রেফারেন্স দিয়ে বলেই দিয়েছে আল্লাহর মুজাহিদদের আল্লাহই রক্ষা করবে। দেখা যাচ্ছে। আল্লাহ, পুলিশ, র‍্যাব, আইন সব এখন এক কাতারে। পালাবার যায়গা নেই।

ব্লগার Shafi Nawaz আপার একটা লেখার কথা মনে পড়ে। লেখার শিরোনাম ছিলো “তনয়ের স্মৃতি ধরে”। মাহবুব তনয় ছিলেন আপার বন্ধু। এক সাথে থিয়েটার করতেন। সে লেখায় তিনি লিখেছিলেন-

“জুলহাজ মান্নান কার সাথে শোবেন, কি উপায়ে শোবেন কিংবা তনয় ছেলেকে ভালোবাসবেন নাকি মেয়েকে ভালোবাসবেন এটি যেখানে একান্তই হবার কথা ছিলো জুলহাজ মান্নানের কিংবা তনয়ের, অথচ সেটি হয়ে গেলো এইসব ধর্মীয় খুনীদের নিজস্ব ব্যাপার। এরা অন্যের ইচ্ছে বা অনিচ্ছাকে একটি সীমার মধ্যে বেঁধে দিয়ে তাদের নিজেদের চাওয়াকে চরিতার্থ করবার ব্যাপারেই উচ্চকিত হোলো। সেই বাঁধা না মানাতে নিজের বাসাতে খুন হয়ে যেতে হোলো নির্মম ভাবে। অথচ এই বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি কি ভয়ানক রকমের নির্বিকার। যেন এমন খুন হওয়াই উচিৎ। নিজের বাসাতে ঢুকে প্রকাশ্য দিবালোকে চাপাতি দিয়ে খুন করে রেখে যায়, খুন করবার পরে ইন্টারনেটে দায়িত্বও স্বীকার করে বেড়ায় অথচ রাষ্ট্র মেরুদন্ডহীন ও শক্তিহীন রূপে নিজেদের অপারগতার কথা শোনাতে থাকে ক্লান্তিহীন নির্লজ্জ কাপুরুষের মতন”

যে কথা বলতে চাই সে কথা তিনিই বলে দিয়েছেন সুতরাং নতুন করে বলবার কিছু নেই।

আমি বরং লেখার শেষটা করি জুলহাজ ভাইয়ের ফেসবুকের একটা কবিতা দিয়ে। তিনি তাঁর ফেসবুকের সর্বশেষ কাভার ফটোতে কাজী নজরুল ইসলামের একটা কবিতার কয়েকটি লাইন লিখেছিলেন-

“শিরাজের নওরোজে ফাল্গুন মাসে
যেন তার প্রিয়ার সমাধির পাশে
তরুন ইরান কবি কাঁদে নিরজনে
ঝরা বন গোলাপের বিলাপ শুনে…”

জুলহাজ ভাই কোনদিন জানবেন না যে শুধু ইরানের কবি নয়, এখন নিরবে আর গোপনে এই দেশটা তার নিজের সমাধির পাশে বসেই কাঁদে। এই দেশ, এই দেশের সীমারেখা, ৫৬ হাজার বর্গমাইল, এই নদী, এই মাটি, এই শষ্যক্ষেত, এই জলাভূমি…সব কাঁদে…

কেউ সে কান্না শুনতে পায়…কেউ পায়না…