সনু নিগম, আজান এবং শব্দ দূষণ

লিখেছেনঃ কামিকাজি

বলিউডের জনপ্রিয় গায়ক সনু নিগম সম্প্রতি আজানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। এই গায়ক তার নিজস্ব টুইটারে লিখেছেন,”অনিচ্ছাসত্ত্বেও প্রতিদিন আজানের শব্দে ঘুম ভেঙে যায়।” গত সোমবার (১৭ এপ্রিল) এমন মন্তব্য করায় সনু বিতর্কের মুখে পড়েন।

তার বক্তব্য, ‘এ প্রথা ধর্মের নামে জোর করে চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। আমি মুসলিম নই, তবু রোজ আজানের শব্দে আমার ঘুম ভেঙে যায়। ধর্মের নামে এই জুলুম কবে বন্ধ হবে এ দেশে?’

সনুর বাড়িতে স্থানীয় মসজিদের মাইক থেকে ভেসে আসে আজানের শব্দ। এর প্রতিবাদেই গায়ক টুইটারে আরও লিখেছেন, ‘হযরত মুহাম্মদ (স.) যখন ইসলাম ধর্মের প্রবর্তন করেন, আশা করি সেই সময় বিদ্যুৎ ছিল না।’ অন্য একটি  টুইটে সনু লিখেছেন, ‘আমার মনে হয় না কোনো মন্দির বা গুরুদুয়ারা কেউই ইলেক্টিসিটি ব্যবহার করে মানুষের ঘুম ভাঙায়!’

17972098_617583211786360_2349328461602486332_o

এখন প্রশ্ন হল, তার দাবী কতটা যৌক্তিক?

ঢাকা শহরে হাজার হাজার মসজিদ। এক গলিতেই দেখা যায় ১০-১২ টা মসজিদ। বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাঙের ছাতার মত মসজিদ গড়ে ওঠে। মসজিদের নামে কারো জায়গা দখল করে নিলেও টু শব্দটি করতে পারেনা কেউ। একবার মসজিদ হয়ে গেলে সেটা ভাঙ্গার সাধ্য কারো নেই। তার উপর কোন ইলেক্ট্রিসিটি বিল,পানির বিল দিতে হয়না। এলাকার মানুষের দয়া দাক্ষিণ্যে গড়ে ওঠে মসজিদ। তাপর শুরু হয় মসজিদের চাঁদার নামে ভিক্ষাবৃত্তি। তারপর আসে একটা মাইক। শুরু হয় অত্যাচার। ডেইলি পাঁচবার করে কর্কশ কন্ঠে কেউ নামাজে যেতে না চাইলেও ডেকে ডেকে মসজিদে আনার একটা চেষ্টা। আজানের সময় হলে ১০-১২ টা মসজিদে একের পর এক শুরু হয় আজান। প্রায় ৫-১০ মিনিট চলতে থাকে এই অত্যাচার। রমজানের সময় হলে তো কথাই নেই। ভোররাত থেকে শুরু হয় সেহরি খাওয়ার আবেদন। তারপর সারাদিন জিকির, কোরান পাঠ চলতেই থাকে। কেন এই অত্যাচার?

এখন সবার হাতেই মোবাইল ফোন থাকে। যার নামাজ পড়ার ইচ্ছা আছে, সে এলার্ম দিয়ে রাখতেই পারে। ডেইলি পাঁচবার চিৎকার করে তাকে মসজিদে নিয়ে যাওয়ার কারন কি? তবুও যদি সবাই যেত। জুম্মার নামাজ ছাড়া প্রায় মসজিদই থাকে খালি। ১৪০০ বছর আগে মুহম্মদের আমলে কি মাইক ছিল? তখন মানুষ নামাজ পড়েনাই?

এখন আসি শব্দদূষণের কথায়। পরিবেশবাদীরাও একই কথা বলেন। ঢাকা শহরে আজানের সময় ১১০-১১৫ ডেসিবেলের শব্দ তৈরী হয় যা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। ঢাকার প্রায় শতভাগ মানুষই, সেই সাথে অন্যান্য শহরগুলোর নাগরিকেরাও শব্দদূষণের কারণে নানা রোগে ভুগছেন। রাজধানীর প্রায় ১২ ভাগ নগরবাসী মাথাব্যথা ও চোখে পানিপড়া, ১৮ ভাগ অবসাদ, ১৫ ভাগ অনিদ্রা, ২৮ ভাগ বদমেজাজ, ২৬ ভাগ কানে কম শোনা এবং তিন ভাগ লোক অন্যান্য রোগে ভুগছেন, সেটাও বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। গবেষকেরা বলছেন, ১৫ বছর পর এই মহানগরের প্রায় ৫০ থেকে ৬০ ভাগ লোক তাদের শ্রবণশক্তি হারাবে বা শ্রবণপ্রতিবন্ধী হবে। শিশুরা হয় সবচাইতে বেশি আক্রান্ত। প্রতিদিন সকালে অনিচ্ছাকৃত ভাবে তাদের ঘুম ভেঙ্গে যায়। যাদের হৃদরোগ আছে তাদের অবস্থা আরো ভয়ঙ্কর।

অনেকেই যুক্তি দেন হিন্দুরাও তো পুজার সময় ঢাক ঢোল পিটিয়ে শব্দ দূষণ করে। তখন কিছু বলা হয়না কেন? হিন্দুরা অন্তত ডেইলি পাঁচবার অত্যাচার করেনা। আপনি যখন কনসার্টে যান তখন কি উচ্চ শব্দের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন? তাদের পুজার সময়ে যেভাবে মাইক ব্যবহার করা হয় এটাও ঠিক না। যার যার ধর্ম পালন করবেন, ঘরের ভিতর। বাইরে নেমে জোর করে সবাইকে আপনার ধর্মের কথা জোর করে শোনানো ঠিক? এই জন্যেই আস্তে আস্তে সব দেশগুলিতে উচ্চ শব্দে মাইক ব্যবহার করা বন্ধ করে দিচ্ছে। ভারতের মুম্বাইতে রাত ১০- সকাল ৬টা পর্যন্ত মাইক ব্যবহার করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে যাতে মানুষের ঘুমের সমস্যা না হয়।

সবার মনের কথা মুখে বলার কারনে এখন সনু নিগম মুসলমানদের শত্রুতে পরিনত হয়েছেন। কেউ কেউ বলছেন ওনার গান নাকি এখন মানুষ খায় না তাই এই স্টান্টবাজি। যারা এতদিন ওনার গান শুনত, অনেক মুসলমান ওনার গান শুনবে না বলে প্রতিজ্ঞা করেছে যদিও মুসলমানদের জন্য গান বাজনা হারাম।এখন সনু নিগমের গান শোনা হারাম কিন্তু অন্যদেরটা আরাম। আবার অনেক হিন্দু সুশীল হতে গিয়ে আজানের সুর নাকি পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর সুর বলে দাবী করছেন। ডেইলি পাঁচবারের জায়গায় কেন দশবার হয়না এই নিয়ে তাদের আক্ষেপ। এই হিন্দু সুশীলরা কেন যে এখনো ইসলাম ধর্ম গ্রহন করছেনা সেটাই মাথায় আসছেনা। ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করার চেষ্টা আর কি।

যাই হোক, এতদিন ভাবছিলাম বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধবে কে? সনু নিগম কে ধন্যবাদ অপ্রিয় সত্য কথাটি বলার জন্য। আমরাও আজানের নামে এই শব্দ সন্ত্রাস থেকে মুক্তি চাই।