শহুরে নারীবাদী ও নারী অধিকার কর্মী

লিখেছেনঃ সিদ্দিকুর রহমান

বাংলাদেশের শহুরে এলিট নারীবাদী আর বাংলাদেশের নারী অধিকার কর্মী এই দুইটি অংশের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। শহুরে নারীবাদী গুলো ঘৃণা ছড়ায় আর সম্মানিত নারী অধিকার কর্মীরা মূলত নারীর উন্নয়নে, নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় নিরলস ভাবে কাজ করেন।

মূলতঃ শহুরে এই নারীবাদীগুলো আসলে এক ধরনের বিভ্রান্ত টাউট। টাউট এই নারীবাদীগুলোর মূল কাজ হচ্ছে ঘরে বসে থাকা আর পৃথিবীর সকল পুরুষকে ঘৃণা করা। এরা মনে করে মুখের মধ্যে আকিজ বিড়ি কিংবা বেন্সন দিয়ে প্রোফাইল ছবি উঠালে কিংবা কপালে ট্যাটু এঁকে ছবি তুল্লেই বুঝি নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়ে গেলো। ব্যাক্তিগত হতাশা, ক্ষোভ, ঘৃণা এসব প্রত্যেকটি নিজের ভেতরে চাষাবাদ করে এরা কি বোর্ড কেন্দ্রিক পুরুষ ঘৃণাবাদ চর্চা করে। এরা মূলত অনেকটা শিয়ালের মত। চৌহদ্দী কিংবা চৌহদ্দীর কেন্দ্র, এর একটি অংশ থেকে একজন টাউট শহুরে নারীবাদী হুক্কা হুয়া জাতীয় চিৎকার করলে, এই চৌহদ্দীর প্রতিটি প্রান্ত থেকে বাকী সব একসাথেই আর্ত-চিৎকার করে থাকে।

বাংলাদেশের সত্যকারের সম্মানিত নারী অধিকার কর্মীরা যেখানে বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ নারীর অধিকার নিয়ে বিনিদ্র রজনী পার করেছেন, মাঠে ঘাটে চষে বেড়িয়ে প্রান্তিক পর্যায় থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিটি অংশে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাচ্ছেন সেখানে এই শহুরে এলিট নারীবাদী টাউটের দল “অনেক বুদ্ধি করে” একটি থিওরী আবিষ্কার করেছে।

কি সেই থিওরী? কিংবা এই থিওরীতে কি বলা হচ্ছে?

সেই থিওরীতে বলা হচ্ছে বাংলাদেশে যে কোনো অপরাধের নামই হচ্ছে আসলে “পুরুষতান্ত্রিক”। আমি এই কথা শুনে চমকে গেলেও বিনীত হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম, সেটা কি করে সম্ভব? এই তথাকথিত টাউটের দল আমাকে জানিয়েছিলেন, জ্বি হ্যাঁ। সকল অপরাধের কেন্দ্রই হচ্ছে পুরুষতান্ত্রিক মানুষিকতার ফসল।

আমি যখনই জিজ্ঞেস করেছি এই যে অনেক নারী হ্যারাস করছে, এই যে ঘরে ঘরে অনেক শ্বাশুড়ী বউদের উপর অত্যাচার করছে কিংবা বউরা শাশুড়ীদের উপর, এই যে ননদ, ভাবী, জা,সতীন কেন্দ্রিক নানাবিধ অত্যাচার, এই যে অনেক নারী ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের সাথে জড়িত, এই যে অনেক নারী প্রতারণা করছেন এগুলো কি সবই পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার ফলে?

আশ্চর্য হলেও সত্য এইসব নির্লজ্জ টাউট শহুরে নারীবাদীরা আমাকে সহাস্যে উত্তর দিয়েছেন জ্বি, এইসব সব কিছুই “পুরুষতান্ত্রিক” মানসিকতার ফসল। মানে দাঁড়াচ্ছে, ঘটনা যাই ঘটুক সেই কেষ্টা ব্যাটাই চোর।তারা আবার এক্সক্লুশন ক্লজের মত ছোট করে নীচে লাগিয়ে দিচ্ছেন এই বলে যে, এখানে “পুরুষতান্ত্রিক” বলতে কিন্তু ভাই পুরুষদের বোঝানো হচ্ছেনা। এখানে পুরুষতান্ত্রিক ব্যাপারটা হচ্ছে সমস্যার নাম।

নারী অপরাধ করলে, নারী অপরাধের সাথী হলে সেটিকে অপরাধ হিসেবে না দেখে একটা লিঙ্গভিত্তিক চিন্তায় সম্পূর্ণ প্রোথিত হয়ে ও নিমজ্জিত হয়ে “পুরুষতান্ত্রিক” আখ্যা দিয়ে এরা আবার পাবলিককে ছয়-নয় বুঝাচ্ছে এটা ভাবতেই আমার এক ধরনের ঘৃণা চলে এলো এইসব টাউটগুলোর উপর।

“পুরুষ” শব্দটি দিয়ে তারা সমস্যার নামকরণ করেছে কিন্তু এতে নাকি পুরুষ বুঝানো হচ্ছেনা। এই হচ্ছে “অনেক বুদ্ধি করে” বের করা থিওরী। একটি ক্রাইমকে নির্মোহ ভাবে বিবেচনা না করে, সেটিকে অপরাধ হিসেবে না দেখে সেখানে এই যে লিঙ্গভিত্তিক ঘৃণার চাষ-বাস সেটি স্বভাবতই সমস্যাকে আরো প্রকট করে তুলছে।

মোট কথা হোলো যে কোনো কিছুকেই এরা গরু রচনায় নিয়ে যাবে। মানে আপনি দাঁড়াচ্ছে, এক ব্যাক্তি সারা জীবনে শুধু গরু রচনা শিখেছে। এখন জীবনের সকল পরীক্ষাতে, যেখানে যে রচনা এসেছে, তিনি সেটিকে গরু পর্যন্ত নিয়ে যান। ধরা যাক পররীক্ষায় এসেছে আমার ছেলেবেলা। তিনি সেটিকে বলেন এইভাবে, “আমি ছোটো বেলায় বড় দুষ্টু ছিলাম। পাশের বাসায় রাখাল ছিলো ওর সাথে চুরি করে আম খেতে যেতাম। ওর ছিলো ৫ তা গরু। সে গরু গুলোর ছিলো দুটি করে কান, একটি লেজ…”

আমার বাবা একজন আইনজীবি। আমি ছোটোবেলা থেকে দেখে এসেছি বাবার কাছে যেসব পারিবারিক মামলা-মোকোদ্দমা গুলো আসত সেখানের বেশীরভাগ মামলাগুলোতে শুনতাম একজন না একজন নারী থাকেন যারা সেই সমস্যার সাথে ভালো করে জড়িত। আমি নিজে যখন আইনজীবি হয়েছি এবং পারিবারিক মোকোদ্দমার রূপ দেখেছি, সেখানেও আমি বেশীরভাগ ক্ষেত্রে নারীকে একটা বড় ভূমিকায় দেখেছি এসব সমস্যার সূত্রপাত ও সেটিকে ইলাস্টিক করণের ক্ষেত্রে।

এইসব ঘটনায় সবচাইতে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে আমাদের সত্যকারের নারী অধিকার আন্দোলন। বছরের পর বছর কিংবা যুগের পর যুগ যেসব নারীরা, নারী ও পুরুষের সমান অধিকার, নারীদের সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা, তাঁদের বঞ্চনাগুলো চিহ্নিত করে সেটি সমাধানে এগিয়ে যাচ্ছিলেন ঠিক তখুনি এইসব এক্সট্রিমিস্ট টাউট শহুরে নারীবাদীগুলো পুরো চেষ্টাটিকে নস্যাৎ করবার জন্য এইসব ঘৃণামূলক থিওরীর উন্মেষ ঘটাবার পাঁয়তারা করছে।

বাংলাদেশে নারীদের সমস্যা একটা নয়, অনেক। দীর্ঘ সময় ধরে পুরুষডোমিনেন্ট সমাজ যেভাবে তৈরী হয়েছে সেখানে নারীর সম অধিকার ধারনাটি প্রতিষ্ঠা করা ছিলো অনেক কঠিন। কিন্তু আশার কথা হচ্ছে নারী অধিকার কর্মীরা যেভাবে এই ধারনাকে, এই সমস্যাগুলোকে আস্তে আস্তে নারীপুরুষ উভয়ে মিলেই সমাধানের চেষ্টা করছে সেটি এক কথায় অভূতপূর্ব।

এই সম্মানিত নারী অধিকার কর্মীরা মূলত নারী-পুরুষের লিঙ্গভিত্তিক অবস্থানের উপরে উঠে ঠিক যেভাবে “সকল মানুষের সমান অধিকার” এই ধারনাতে ধাবিত হয়েছে, তাতে করে বিদ্বেষের আশংকা সম্পূর্ণ নাশ হয়েছে এবং পুরুষ ডোমিনেন্ট সমাজ ঠিকি অনুধাবন করতে পেরেছে যে, পুরুষের মত নারীর সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা ছাড়া সামাজিক টোটাল স্ট্যাবিলিটি আসাটা অসম্ভব।

নারী অধিকার নিয়ে যারা কাজ করছেন, যারা বিদ্বেষ না ছড়িয়ে একটি চমৎকার সমাজের রূপকল্পে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন আমি সেসব নারী অধিকার কর্মীদের জানাই অভিবাদন। আপনারা দয়া করে আমার কুর্নিশ গ্রহন করবেন।